শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৯ অপরাহ্ন

সুস্থ হওয়ার পরও স্বজনেরা খোঁজ নেয়নি তাদের

নিজস্ব প্রতিনিধি, পাবনামেইল টোয়েন্টিফোর ডটকম
  • প্রকাশিত রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২০
Pabnamail24

প্রায় ৩২ বছর আগে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নাজমা নিলুফার নামে এক নারীকে। বহু বছর আগেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর হাসপাতালে ভর্তির সময় রেজিস্টারে তার ঢাকার মিরপুরের যে ঠিকানা দেয়া হয়েছিল, সেখানে তাকে পাঠানো হয়। কিন্তু সে ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই। বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাজমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এখন তার ঠিকানা ১৫ নম্বর ওয়ার্ড।

নাজমা আক্তার নামে আরেক নারী, যার বাড়ি গাজীপুরের নীলনগর গ্রামে। তিনি ২০১১ সাল থেকে একই হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। মানসিক স্থিতিশীলতা আসার পর চলতি বছরের ২ মার্চ তাকে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু নাজমার বাড়ির লোক তাকে গ্রহণ করেনি।

পরিবার আর সমাজের কাছে ‘বোঝা’ মনে হওয়া এই নারীরা আজও অপেক্ষায় আছেন একদিন কেউ না কেউ তাদের নিতে আসবে। এমন প্রেক্ষাপটে  শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।

শুক্রবার সকালে পাবনা মানসিক হাসপাতালের  ১ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে গ্রিলের ভেতরে দাঁড়ানো মাসুম নামের এক রোগী বলেন, ভাই, আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার গিরিশপুর গ্রামে। আমার বাড়ির কাউকে খবর দেবেন, যেন আমাকে নিয়ে যায়।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে মাসুমের এই আর্তি কি স্পর্শ করতে পারবে তার পরিবারের লোকদের? কিংবা নাজমা নিলুফার বা নাজমা আক্তারের মতো যারা সুস্থ হয়েও স্বজনদের কাছে ফিরতে আকুল, তারা কি পারবেন ফিরে যেতে?

হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুস্থ হওয়ার পরও স্বজনেরা ফিরিয়ে নেয়নি এমন অন্তত ১১ জন বছরের পর বছর হাসপাতালে আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার মধ্য বাসাবো এলাকার বদিউল আলম ১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৫ বছর ধরে, মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার সাঈদ হোসেন ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ বছর, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাবনা পৌর এলাকার আটুয়া মহল্লার ডলি ৯ বছর, একই ওয়ার্ডে রাধানগর মহল্লার জাকিয়া সুলতানা ১১ বছর, ঢাকার শাঁখারীবাজারের শিপ্রা রানী রায় ২১ বছর, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকার টিকাটুলী এলাকার শাহনাজ আক্তার ২১ বছর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের নাইমা চৌধুরী ১১ বছর, কাটাসুর এলাকার গোলজার বিবি ২০ বছর এবং মোহাম্মদপুর এলাকার অনামিকা (বুবি) ২১ বছর ধরে পড়ে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারাজনিত কারণে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এসব রোগী সুস্থ হলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা ফিরিয়ে নিতে চায় না। পরিবারের কোনো সদস্য মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে সমাজ স্বাভাবিকভাবে দেখে না বলেও কেউ কেউ তাদের স্বজনদের হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। এ কারণে অনেক রোগীর স্বজনই হাসপাতালে ভর্তির সময় ভুল নাম বা ঠিকানা দেয়।

নাজমা নিলুফারকে ভর্তির সময় হাসপাতালের রেজিস্টারে বাবার নাম লেখা হয়েছিল এ কে লুত্ফুল করিম। ঠিকানা দেয়া হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশন। ৩১ বছর পাঁচ মাস আগে ১৯৮৯ সালের ১ এপ্রিল যখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ২৮ বছর। সেই নাজমার বয়স এখন ৬০ বছর। হাঁটতে কষ্ট হয়, শ্রবণশক্তিও কমে এসেছে অনেকখানি। গভীর হতাশা গ্রাস করেছে তাকে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার রায় জানান, হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী সুস্থ হওয়ার পর স্বজনেরা নিয়ে না গেলে হাসপাতালের কর্মচারীদের দিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভর্তির সময় রেজিস্টারে দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী নাজমা নিলুফারকেও মিরপুরের ওই ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে ঠিকানার কোনো অস্তিত্বই নেই।

আবার ঠিকানা অনুযায়ী যাদের বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেছে, পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, সারা দেশে হাসপাতালে মানসিক রোগীদের জন্য মাত্র ৯০০ শয্যা রয়েছে। পাবনা মানসিক হাসপাতালের কিছু শয্যায় সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করতে সংকট হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মো. মাসুদ রানা সরকার  বলেন, ছাড়পত্র পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালের ওয়ার্ডে পড়ে রয়েছেন ওই ১১ জন। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেয়া হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হতাশা, বার্ধক্যসহ নানা কারণে তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থার খানিকটা অবনতি হয়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন এসব নারী-পুরুষ সুস্থ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে যেতে চান। কিন্তু তাদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের অনীহার বিষয়টি যখন তারা উপলব্ধি করতে পারেন, তখন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!