বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ

বাড়িভাড়া দেন না পাবিপ্রবি ভিসি, তদন্তে দুদক

নিজস্ব প্রতিনিধি, পাবনামেইল টোয়েন্টিফোর ডটকম
  • প্রকাশিত মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০
Pabnamail24

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের বাড়িভাড়া ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। বিশ^বিদ্যালয় আইন ও ইউজিসি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, সুকৌশলে উপাচার্যের বাসভবনকে গেস্ট হাউজ ঘোষণা করে, বাড়ি ভাড়া ফাঁকি দিচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি, উপাচার্যের বেতন বিলেও বাড়ি ভাড়া না দেয়ার প্রমান মিলেছে। এমন কান্ডকে সুস্পষ্ট অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত বিশ^বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকরাও। তদন্ত শুরু করেছে দুদকও।

ইউজিসি ও পাবিপ্রবি সূত্র জানায়, উপাচার্যের নিয়োগপত্রের নীতিমালায় রয়েছে, ‘উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন।’ সে লক্ষ্যে প্রথম প্রজেক্টেই পাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে প্রায় চার বিঘা জমির প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যায়ে উপাচার্যের বাসভবন নির্মাণ করা হয়। বাসভবনটি মেরামতের জন্য প্রতিবছর ইউজিসি থেকে অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের মূল বাজেটে ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে উপাচার্যের বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে কর্তনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয় ইউজিসি। তবে, উপাচার্য তার তোয়াক্কা না করে দৈনিক ১২৯ টাকা হারে ভাড়ায় এখানে থাকেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার সুস্পষ্ট শর্ত সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসের অবস্থানের বিষয়টিও আমান্য করে প্রায়ই রাজশাহীতে নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন উপাচার্য।

সরেজমিনে গত রবিবার পাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে দেখা যায় সেখানে নিরপত্তার দায়িত্বে থাকা ৯ জন আনসার সদস্য ছাড়াও উপাচার্যের পিয়ন, আর্দালি, মালি, বাবুর্চিসহ ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন ১৫ জন কর্মচারী। তারা উপাচার্যের বাসভবনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত। বিশ^বিদ্যালয় তহবিল প্রতিমাসে তাদের বেতন ভাতায় ব্যয় হয় কয়েক লাখ টাকা। গেস্ট হাউস হিসেবে ঘোষণা করলেও উপাচার্য তার বাসভবনের জন্য বরাদ্দ সকল সুবিধাদিই গ্রহণ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড়ীর এক কর্মচারী জানান, বাড়িটিকে গেস্ট হাউজ বলা হলেও এখানে ভিসি স্যার, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি স্যারের শিক্ষক রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রঞ্জিত কুমার ও পাবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ার পারভেজ খসরু ব্যতীত কোনো গেস্ট আমার চোখে পড়েনি।

সম্প্রতি, গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে আসা উপাচার্যের একটি বেতন বিলে দেখা যায়, তিনি বাড়িভাড়া বাবদ বেতন থেকে উত্তোলন করেছেন ৩১,২০০ টাকা ইউজিসির নির্দেশনা মতে তা কর্তন না করে গেস্ট হাউজের ঐ মাসে ভাড়া হিসেবে কর্তন করেছেন ৩,৮৭৫ টাকা। এতে তিনি প্রতিমাসে ফাঁকি দিয়েছেন ২৭ হাজার ৩২৫ টাকা । এই হিসেবে ভিসি তার মেয়াদকালে গত পৌনে তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সরকারকে ফাঁকি দিয়েছেন ৯ লক্ষ ১ হাজার ৭২৫ টাকা।

এদিকে, পাবিপ্রবি উপাচার্যের জন্য বরাদ্দ বাড়িটি গেস্ট হাউজ ঘোষণা করার এখতিয়ার ভিসি রোস্তম আলীর নেই বলে জানিয়েছেন , ইউজিসি-র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, নিজের মত করে নীতিমালা বানিয়ে বাড়িভাড়া কর্তন না করা ‘আইনসিদ্ধ নয় এবং তা নিয়ম বহির্ভূত’। কোনো অবস্থাতেই গেস্ট হাউস ঘোষণা করে বসবাস করার সুযোগ নেই, কারণ এতে বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এমন কান্ডকে লজ্জাস্কর অভিহিত করে, প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। পাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম বলেন, ভিসি স্যারের বাসভবন গেস্ট হাউস দেখিয়ে বিধি মোতাবেক ভাড়া না কাটলেও তাঁর রাজশাহীর বাড়ির বুয়ার বেতন থেকে শুরু করে সমুদয় খরচ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নেন। এই দুই বাড়ির জন্য উপাচার্য মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যত কর্মচারী খাটান এবং যত অর্থ ব্যয় করেন তা বহন করা একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব কিনা সেটা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকরও বটে।

গেস্টহাউজ ঘোষণা করা ভিসির বাসভবনে বসবাসকারী পাবিপ্রবি কোষাধ্যক্ষ ড. আনোয়ার পারভেজ খসরুর নিকট সেখানে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ে আমার কোন আবাসন নেই। ভিসি স্যার তার বাংলোকে গেস্ট হাউজ করায়, সেখানে ভাড়া দিয়ে অবস্থান করি। অনিয়ম হয়েছে কিনা সেটা ভিসি স্যার ভালো বলতে পারবেন।

তবে, বাংলোকে গেস্ট হাউজ করায় কোন অনিয়ম হয়নি বলে দাবী করেছেন, পাবিপ্রবি উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলী। তিনি বলেন, উপাচার্যের জন্য বরাদ্দ বাড়িটির কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। এটা কোন বাংলোই হয়নি। তা পরিত্যাক্ত ফেলে না রেখে গেস্ট হাউজ করায় তাতে বিশ^বিদ্যালয় কিছু টাকা অন্তত পাচ্ছে।

বরাদ্দ হওয়া অর্থ দিয়ে বাড়ির সংস্কার করা যেতো কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এখানে গার্ডরুম, ড্রাইভার রুম, কুকের রুম সহ অনেক কিছুই নেই সংস্কার করে তা নির্মান সম্ভব নয়। নতুন করে তৈরী করতে হবে। রাজশাহীর ব্যাক্তিগত বাসভবনের খরচ নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের ভিসিরা নিয়েছেন তাই আমিও নেই।

এদিকে, বাড়িভাড়া ফাঁকি, পরিবহন পুলে দূর্ণীতিসহ পাবিপ্রবি ভিসির বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে তদন্ত নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক পাবনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!