বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০৫:২৮ অপরাহ্ন

ভাষাসংগ্রামী রণেশ মৈত্র : এই লভিনু সঙ্গ তব

ড. এম আবদুল আলীম
  • প্রকাশিত সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২
Pabnamail24

রণেশ দা-র আহ্বানে তাঁর নব্বইতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিতব্য সম্মাননা গ্রন্থের জন্য মাসখানেক আগে এ লেখাটি লিখে তাঁকে মেইল করেছিলাম। আজ তাঁর আকস্মিক-প্রয়াণে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি ঈষৎ সংযোজন-বিয়োজন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম।

এক.
জাতীয় জীবনে এমন কতক অধ্যায় আসে, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে নতুন ইতিহাস, জন্ম হয় নবজীবনের আলোক-দিশারিদের। সেই আলোক-দিশারিগণ হন অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে এমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়, যা তাদের প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল এবং জাগিয়ে তুলেছিল। শুধু তাই নয়, দল-মত নির্বিশেষে তাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছিল। এ আন্দোলন তাদের চেতনায় এমন এক বোধের জন্ম দেয়, যা থেকে শক্তি সঞ্চয় করে তারা সামনে এগিয়ে প্রেরণা ও শক্তি লাভ করে। একুশের উত্যুঙ্গ মুহূর্তে তারা রক্তের শপথে বলিয়ান হন এবং ভাষা-সংস্কৃতির গৌরব ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সামনে চলার প্রেরণা ও শক্তি লাভ করেন, যা ধাপে ধাপে তাদের পৌঁছে দিয়েছিল স্বাধীনতার চূড়ান্ত মোহনায়। এই যে সংগ্রামের দীর্ঘ পথ, সেই পথে শামিল হয়েছিলেন অগণন আলোক-দিশারী, যাঁদের একজন আমাদের পাবনা শহরের প্রিয় রণেশ দা।
রণেশ মৈত্র নামটির সঙ্গে পরিচিত হই অল্প বয়সে; বিশেষ করে, যখন থেকে নিয়মিত পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানো শিখেছি। প্রাত্যহিক সংবাদ অপেক্ষা নানা বিষয়ের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নসমৃদ্ধ কলামই আমাকে বেশি আকৃষ্ট করতো। সেই কলামে চোখ মেললে প্রায়ই চোখে পড়তো রণেশ মৈত্রর নাম। সাম্প্রদায়িক সংঘাত, জঙ্গিবাদ, সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্ভোগ, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও দেশ-কালের বিচিত্র প্রসঙ্গ তাঁর কলামে স্থান পেতো। সেসব পাঠ করে আমার কিশোর মনে তাঁর নামটি স্থায়ী আসন লাভ করে। ১৯৯৭ সালে পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার কাজে পাবনায় ফিল্ডওয়ার্ক করতে এসে রণেশ মৈত্রর সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ঘটে। পাবনার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সমকালীন নানা বিষয় জানতে তাঁর শরণাপন্ন হই। ২০০৫ সালে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে শিক্ষকতাসূত্রে পাবনা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে এসে রণেশ মৈত্রকে আরও নিবিড়ভাবে দেখার সুয়োগ ঘটে। তাঁর বেলতলা রোডের বাড়ি এবং প্রেসক্লাবে নিয়মিত আলাপ ও দেখা-সাক্ষাৎ হয়। শহরের অনুষ্ঠানাদি কিংবা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠের বক্তৃতা শুনেছি বহুবার। সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ; নানান পরিচয় ও গুণে তিনি আমাকে আকৃষ্ট করেন। মাঝখানে কয়েক বছর ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করতে যাওয়ায় তাঁর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল না। ২০১২ সালে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাসূত্রে আবার পাবনা শহরে এলাম। রণেশ দা’র সঙ্গে আবারও শুরু হলো নিয়মিত যোগাযোগ। এ সময় পাবনা জেলার ভাষা-আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নতুনরূপে রণেশ মৈত্রকে আবিষ্কার করলাম, পরিচিত হলাম তাঁর তেজোদীপ্ত যৌবনের সোনালি প্রহরের সংগ্রামী দিনগুলোর সঙ্গে। ভাষাসংগ্রামীদের সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানলাম রণেশ মৈত্র এবং তাঁর সতীর্থরা কীভাবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পুলিশের রক্ষচক্ষু উপেক্ষা করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাছাড়া তাঁর বক্তৃতা, কলাম, বই-পুস্তক এবং বিভিন্ন সময় গ্রহণকৃত সাক্ষাৎকার থেকে জেনেছি ব্যক্তি ও সংগ্রামী রণেশ মৈত্রকে। বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচায় সবচেয়ে বেশিবার যে রাজনৈতিক বন্দির কথা উল্লেখ আছে, তিনি হলেন পাবনার রণেশ মৈত্র।

দুই.
রণেশ মৈত্রর পৈত্রিক নিবাস পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া গ্রামে। জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ অক্টোবর। ১৯৪৭ সালের জুন-জুলাই মাসে সপরিবারে চলে আসেন পাবনা শহরে। কৈশোরেই যাত্রা শুরু করেন ¯্রােতের বিপরীতে। দেশভাগের অব্যবহিত পরে পাবনার যেসব কিশোর বামপন্থায় দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং মুসলিম লীগের চেতনাধারার বিপরীতে প্রগতিশীল রাজনীতির বীজমন্ত্র ধারণ করেছিলেন, রণেশ মৈত্র ছিলেন তাঁদের অগ্রগণ্য। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা তাঁরা সেই তরুণ বয়সেই ধরেছিলেন; আর সেজন্যেই বলতে পেরেছিলেন ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়’। পাবনা জিসি ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হয়ে সেখান শিক্ষক জ্যোতিভূষণ চাকীসহ অন্যদের সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন বিপ্লবের দীক্ষামন্ত্র। আমিনুল ইসলাম বাদশা, আবদুল মতিন লাল মিয়া, জয়নাল আবেদীন খান, কামাল লোহানী, ফজলে কবীর, নাঈমুল হাসান, রূপবাণী শিকদার, খালিদ হাসান, পরেশ দে, শাহজাহান মাহমুদ, তাছির উদ্দিনসহ অন্য তরুণদের সঙ্গ-সান্নিধ্য তাঁকে সাংস্কৃতিকভাবে যেমন দীপ্ত করে তেমনি রাজপথের সংগ্রামেও নেতৃত্বদানের শক্তি-সাহস জোগায়। পাবনা শহরের মোকতার পাড়ার গড়ে ওঠা প্রগতিশীল তরুণদের সংগঠন ‘শিখা সংঘ’ তাঁর প্রগতিশীল চেতনাকে আরও শাণিত করে। আটচল্লিশ এবং বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ দেশ-মাতৃকা ও মাতৃভাষার প্রতি তাঁর গভীর ভলোবাসা ও দায়বদ্ধতারকে মূর্ত করে। বস্তুত, ভাষা-আন্দোলনই কিশোর রণেশ মৈত্রকে নিয়ে আসে পাবনার রাজনীতি ও রাজপথের পাদপ্রদীপের আলোয়। এর ফলে পাকিস্তানি সরকারের কোপ দৃষ্টিতে পড়েন। বছরের পর বছর বিনবিচারে জেল খাটেন। তরুণ রনেশ মৈত্রর উজান ¯্রােতে বুক চিতিয়ে এগিয়ে চলার বিবরণ আছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে, যার কিছু দলিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পাদনায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু ও সোহরাওয়ার্দী ঊষ¦রদী জনসভা করতে এলে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রণেশ মৈত্রসহ ছাত্রনেতারা সেই জনসভায় যোগ দেন। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, অমূল্যনাথ লাহিড়িসহ অগণিত রাজনীতিবিদের। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পাবনা শহরে আসেন তাঁর দলের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারের কাজে। তাঁকে অপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করেন রনেশ মৈত্র। ভোজন রসিক শেরেবাংলার সেই রসনাবিলাসের কথা রণেশ মৈত্র উল্লেক করেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে। ভাষা-আন্দোলনের অব্যবহিত পরে গড়ে ওঠা প্রগতিশীল ছাত্র-তরুণদের সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন তাঁর আদর্শকে আরও দৃঢ় করে এবং নেতৃত্বদানের গুণাবলি দান করে। তিনি স্বাধিকার-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে থেকের মিছিলের অগ্রভাগে। বারবার দল বদলালেও বদলাননি প্রগতিশীলতার আদর্শ।
তাঁর চলার পথ মসৃণ ছিল না, সাংসারিক টানাপোড়েন তো ছিলই, তার চেয়ে বেশি ছিল মুসলিম লীগ সরকার ও তাদের লেলিয়ে দেওয়া গোয়েন্দা ও গু-াবাহিনীর দৌরাত্ম্য। মাসের পর মাস কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন নি। সন্দেহের তীর সবসময়ই তাক করা থাকতো তাঁর ওপর। প্রাত্যহিক ক্রিয়া-কর্ম তো বটেই, এমনি ব্যক্তিগত জীবনেও থাকতেন কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে। তাঁর বিয়ের আসরে পর্যন্ত হানা দিয়েছে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা। শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের সন্দেহের তীরে সে পেশা ছাড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। রাজনীতির চ্যালেঞ্জিং পথে পা বাড়ালেও সাংবাদিকতায় যতটা ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছেন, রাজনীততে ততটা আলো ফেলতে পারেননি। এমনকী পসার জমাতে পারেননি ওকালতি পেশায়ও।

তিন.
রণেশ মৈত্র আড্ডাপ্রিয় মানুষ। যতবারই তাঁর বেলতলা রোডের বাড়িতে গেছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যে কীভাবে কেটে গেছে বুঝতে পারিনি। ঠাট্টা-রসিকতায় বেশ পটু তিনি। অতীতের স্মৃতিচারণা করতে করতে কিংবা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আলাপের মধ্যেই হাজির করেন এমন প্রসঙ্গ, যাতে মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় একঘেঁয়েমি। তাঁর সহধর্মিণী পূরবী মৈত্রও কম যান না। দিদি গল্পের আসরে এসে কিছুক্ষণ বসেই মেরে দেন এক খোঁচা, ‘দেখো, বুড়োর ঢং দেখো!’ দাদা তাতে বিরক্ত না হয়ে আরও উৎসাহ পান। রণেশ দা-র আড্ডার বড়ো জায়গা জুড়ে থাকে শৈশবের স্মৃতি, যৌবনের উত্তাল দিনগুলোর কথা আর কারাগারের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা। জীবনের পথে পথে অর্জন করা বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে আবেগ-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁর পৈত্রিক ভিটার দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার। শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে করতে একদিন তুললেন, আমাদের বাড়ির পাশের ঘুঘুদহ বিলের কৈ মাছ খাওয়ার কথা। সেই কৈ মাছের স্বাদ নাকি তাঁর মুখে এখনো লেগে আছে। শুধু গল্প নয়, বায়না ধরলেন ঘুঘুদহ বিলের বড়ো সাইজের কৈ মাছ তাঁকে খাওয়াতেই হবে! গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানলাম বর্ষা মৌসুম শেষ হলে বিলে কৈ মাছ পাওয়া যায়। একদিন আমার আব্বা পাঠালেন কেজি দশেক কৈ ও শিং মাছ। সাইজ তেমন বড়ো নয়। আমার সহধর্মিণী প্রীতিকে বললাম, রণেশ দা কৈ খেতে চেয়েছেন। বললেন, নিয়ে যাও বৃদ্ধ মানুষ, কখন কি হয়? প্রীতি দশটি কৈ এক প্যাকেটে ভরে দাদার বাড়িতে পৌঁছে দিতে বললো। কৈ দেখে তো দাদার মুখে হাসি ধরে না। বললেন, সত্যিই তুমি কৈ নিয়ে এসেছো? শুধু তাই নয়, ওইদিন রাতে দাদা ফোন দিয়ে কৈ খাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন। ছোটোবেলার কৈ-এর স্বাদ পেয়ে তিনি শিশুর মতো আবেগাপ্লুত হন। এটাই আমাদের রণেশ দা-র আসল রূপ। বাইরে থেকে গম্ভীর ও রাশভারী মনে হলেও ভেতরটা ছিল শিশুর মতো।
একবার আড্ডা দিতে দিতে বললাম, দাদা আত্মজীবনী লিখে ফেলুন। চোখের সামনে যা দেখেছেন, জীবনের যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, যাঁদের সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ করেছেন, তাঁদের নিয়ে যতটুকু মনে আছে লিখে ফেলুন। করোনা অন্ধকারভরা দিনগুলোর কেটে গেলে একদিন তাঁর বাড়িতে গেছি, সামনে এগিয়ে দিলেন দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদের একটি বই। দাদার শাল-পাঞ্জাবি পরা সাদামাট ছবিসহ বইটির প্রচ্ছদে চোখ পড়তেই আনন্দ-আর বিস্ময়ে অভিভূত হলাম এই ভেবে যে, রণেশ দা শুধু আত্মজীবনী লেখেনই নি, তা একটি বনেদি প্রকাশনী থেকে প্রকাশও করেছেন। বইটি হাতে নিয়ে বাসায় ফিরে এক বসায় পড়ে ফেললাম। দাদাকে বললাম, একজীবনে আপনি যা কিছু করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম সেরা কাজ এই আত্মজীবনী বইটি। গত এক শতাব্দীর ইতিহাসের জীবন্ত দলিল তাঁর আত্মজীবনী। স্থানীয় ও জাতীয় ইতিহাসের বিচিত্র উপাদানে ভরপুর বইটি। কিছুদিন আগে তাঁর বাড়িতে গেলাম কবি ওমর আলীর ওপর একটি লেখার আবদার নিয়ে। রনেশ দা শৈল্পিক কারুকাজের হস্তলিপিতে লেখা দিলেন। তাঁর উপস্থাপন ভঙ্গি যেমন সাবলীল তেমনি বিশ্লেষণী ক্ষমতাও অসাধারণ। তাঁর লেখায় সহজপ্রাণ ও সরলজীবনের ওমর আলী এমনভাবে ফুটে উঠেছে, যা পড়ে কবিকে চিনে নিতে একটুও অসুবিধা হয় না।

চার.
রণেশ মৈত্র আদর্শবাদী মানুষ। তাঁর লেখা ও কাজে স্ববিরেধিতা যে একেবারে ছিল না, তা নয়; তবে সেসব উৎরিয়ে রণেশ মৈত্র সারাজীবন স্বীয় আদর্শকে আঁকড়ে দৃঢ়ভাবে পথ চলেছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্ভয়ে লেখনী ধারণ করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইসুতে তিনি ছিলেন নির্ভীক ও আপোসহীন। দীর্ঘকালের সাংবাদিকতার স্বীকৃতি-স্বরূপ লাভ করেছেন একুশে পদক। তাঁর সঙ্গ-সান্নিধ্য পাবনা শহরে আমার পরম পাওয়া। আরও দীর্ঘদিন তাঁর ¯েœহের পরশ দীপ্ত হতে চেয়েছিলাম। আশা করেছিলাম আমাদের মাথার ওপরে আশীর্বাদের হাত রেখে একশোয় পৌঁছে যাবেন। কিন্তু তিনি থেমে গেলেন নব্বুইয়ে না পৌঁছুতেই। আগামী ৪ অক্টোবর তিনি নব্বইতে পেঁছাতেন, তার আগেই পরপারের ডাক এসেছিল তাঁর। আজ ভোরে চলে গেলেন। পরিণত বয়সে অনেক সম্মান নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা তাঁকে একুশে পদক দিয়ে সম্মানীত করেছেন। দেশবাসীর কাছে পেয়েছেন নিরঙ্কুশ ভালোবাসা। পাবনার মানুষের কাছেও পেয়েছেন সীমাহীন ভালোবাসা। তাঁর মৃত্যুতে পাবনা শহরে এবং দেশের সারস্বত সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি অগণিত মানুষ জানিয়েছে সমবেদনা। তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান পাবনা প্রেসক্লাব তাঁর সম্মানে সাতদিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এই সংগ্রামী ও দৃঢ়চেতা মানুষটিকে শেষবিদায়ে জানাই শ্রদ্ধা। তিনি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন স্বীয় কর্মের ভেতর। তাঁর পাঁচটি বই (‘রুদ্র চৈতন্যে বিপন্ন বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ কোন পথে?’, ‘আত্মজীবনী’, ‘আঁধার ঘোচানো বঙ্গবন্ধু’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’) ও অগণিত কলাম পাঠকের মাঝে মুগ্ধতা ছড়াবে যুগের পর যুগ। তাঁর সংগ্রামী চেতনা এবং ক্ষুরধার লেখনীর অমৃত বচন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মনে জানাবে শক্তি-সাহস ও প্রেরণা।

লেখক-পরিচিতি : ড. এম আবদুল আলীম, গবেষক-প্রাবন্ধিক; সাবেক ডিন, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

বিভাগের আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!